ইন্টারনেট সংস্কৃতি ও বিশ্বব্যবস্থা

সারা বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত, পরস্পরের সাথে সংযুক্ত অনেকগুলো কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সমষ্টি যা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং যেখানে আইপি বা ইন্টারনেট প্রটোকল নামের এক প্রামান্য ব্যবস্থার মাধ্যমে ডেটা আদান-প্রদান করা হয় তাকে ইন্টারনেট বা অন্তর্জাল বলে। অর্থাৎ ইন্টারনেট এক বিশেষ ধরনের যোগাযোগ প্রযুক্তি যা বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হয়।



ইন্টারনেটের ইতিহাস

২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ক্লেউনরক ল্যাবে বসে ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টের দুটি কম্পিউটারের মাঝে সংযোগ ঘটাতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে ২৯ অক্টোবর দুটি সাইটের মাঝে প্রথম সফলভা েতথ্য প্রদান করা হয়। ঠিক সেই মুহুর্তেই জন্ম হয় ইন্টারনেটের পূর্ব পুরুষ “আরপানেট” নেটওয়ার্কের। মার্কিন প্রতিরক্ষা গবেষণা বিভাগের গোয়েন্দা সংস্থা “আরপা” (Advanced Research Projects Agency-ARPA)- এর উদ্দেশ্য ছিল প্রযুক্তির মাধ্যমে সারা বিশ্বকে হাতের মুঠোয় আনা। ARPA`র উদ্যোগে তৈরি করা হয় বলেই নাম হয় ‘আরপানেট’ (Advanced Research Projects Agency Network-ARPANET)। ২৫ জুলাই ১৯৭৩ প্রথম আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আরপানেটের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপিত হয় লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের। ১৯৭৩ সালেই আরপানেটের রবার্ট বব কান এবং ভিনটন গ্রে কার্ফ প্রথমবারের মতো তৈরি করেন ট্রান্সমিশন কন্ট্রোল প্রটোকল এবং ইন্টারনেট প্রটোকল ( TCP/IP), যা ইন্টারনেটকে পূর্ণতা দান করে। ১ জানুয়ারী১৯৮৩ সালে আধুনিক ইন্টারনেট চালু করে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। নেটওয়ার্ক কন্ট্রোল প্রট্রোকলকে (NCP) সরিয়ে চালু করা হয় ট্রান্সমিশন কন্ট্রোল প্রটোকল এবং ইন্টারনেট প্রটোকল (TCP/IP)। ১৯৮৯ সালে যুক্তরাজ্যের গবেষক টিম বার্নার্স লি প্রথম ওয়াল্ড ওয়াইড ওয়েব ধারণার অবতারনা করেন এবং ১৯৯১ সালে www software on internet এর ঘোষণা দেন। ৩০ এপ্রিল  ১৯৯৩ সালে ফ্রি সফটওয়্যার হিসেবে world wide web উন্মুক্ত করা হয়। উল্লেখ্য, ৬ জুন ১৯৯৬ বাংলাদেশে ইন্টারনেট চালু হয়।

ইন্টারনেট সংস্কৃতি 

ইন্টারনেট সংস্কৃতি হলো একটি সম্পূর্ণ নতুন সংস্কৃতি যা আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির সাথে সংযুক্ত এবং ইন্টারনেটের আবিষ্কার ও বিকাশের ফলে উদ্ভব হয়। এটি মানসিকতা, আদর্শ, নীতি ও নীতিমালা, উচ্চতর ভাবনা এবং সম্প্রদায়ের উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়। অর্থাৎ এটি ইন্টারনেটের ব্যবহার ও পরিচালনায় যেসব সংস্কৃতি ও নীতিমালা রয়েছে তা দ্বারা সংগঠিত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানসিকতা। ইন্টারনেট ব্যবহার করে সৃষ্টিশীল হওয়া এবং অনলাইনে কমিউনিটি, সোশ্যাল মিডিয়া, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ই-কমার্স এবং বিভিন্ন িইন্টারনেট প্লাটফর্মের মাধ্যমে তৈরি হওয়া যা পরিবর্তন করে সাংস্কৃতিক প্রথাগতি। এটি দর্শকের মধ্যে সাম্প্রতিক সংস্কৃতিক গঠন এবং প্রচারণার সম্পর্কে পরিচিতি প্রদান করে এবং কীভাবে মানুষের সংস্কৃতি ও নীতিমালা পরিবর্তন হয় তা নিয়ে আলোচনা করে।

বিশ্বব্যবস্থা

বিশ্বব্যবস্থা বলতে বোঝানো হয় পৃথিবীর সমস্ত দেশগুলোর সমন্বয়ে সহযোগিতার মাধ্যমে গঠিত প্রতিষ্ঠান, নীতি এবং সংস্থা যা বিশ্বের বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে এবং বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সহায়তা প্রদান করে। ইন্টারনেট সংস্কৃতি সম্পর্কে বিশ্বব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে সংস্কৃতি, সামাজিক মানসিকতা, অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রযুক্তির প্রভাব, নীতি ও নীতিমালা, ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিবর্তন ইত্যাদির ওপর আলোকপাত করতে হয়।

প্রযুক্তির প্রভাব

ইন্টারনেট সংস্কৃতি বিশ্বব্যবস্থার অংশ হিসেবে অজস্র সংস্থা, প্রোটোকল এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রদর্শণসহ অসংখ্য সেবা প্রদান করে। যেমন- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যবসা-বানিজ্য, অফিস-আদালত, বিভিন্ন গবেশণা, বিভিন্ন মার্কেট, উন্নত যানবাহন, নিজস্ব বা ভাড়াটে বাড়ি, দামী রেস্টুরেন্ট, গোপন নিরাপত্তা, ক্রয়-বিক্রয়,  ফাইল-ডাটা সংরক্ষণ, ধর্মীয় রীতি-নীতি চর্চা, পত্র-পত্রিকা পাঠ, মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের যে কোন প্রান্তে কথাবার্তা, তথ্য আদান-প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে বর্তমানে ইন্টারনেট অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশ, কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংক পর্যন্ত ইন্টারনেটের সহায়তায় লেনদেন ও হিসাব-নিকাশ করে থাকে। গুগল, ফেসবুক, ইমো. টুইটার, ইউটিউবসহ নানা প্রকার সামাজিক সাইটগুলোতে প্রতিদিন কোটি কোটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদান-প্রদান করেছে। ইন্টারনেটের অবদানে ইউটিউব, ফ্রিল্যান্সিং, আউটসোর্সিং এবং পিটিসিসহ ইত্যাদি প্রযুক্তির সহায়তায় লক্ষাধিক বেকার যুবক-যুবতী থেকে শুরু করে চাকুরীজীবী, ছাত্র-শিক্ষক, নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, অফিসার-কর্মচারী সকল বয়সের মানুষ উপার্জন করছে। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, পিসি ও অ্যান্ড্রয়েড সেটগুলো বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য শিক্ষার একটা বড় অংশ হয়ে দাড়িয়েছে ইন্টারনেটের উপর ভিত্তি করে।

সংস্কৃতির পরিবর্তন

ইন্টারনেট সংস্কৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এটি বিশ্বব্যাপী প্রভাব রাখে ও নিজস্ব সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে। ইন্টারনেট সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষেরা বিভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম, রাষ্ট্রীয়তা এবং অন্যান্য সামাজিক  পরিচিতিকে প্রভাবিত করতে পারেন। ইন্টারনেট একটি অভিনব প্রযুক্তি যা মানুষের মধ্যে যুক্তি ও যোগাযোগ সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রথার মধ্যে বিচরণ সহজে করে এবং নতুন সামাজিক পরিবর্তন ও রুপান্তর সৃষ্টি করে।

সামাজিক মানসিকতার রুপান্তর

বিশ্বব্যবস্থার অংশ হিসেবে ইন্টারনেট সংস্কৃতি সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এটি একটি প্রাসঙ্গিক সামাজিক ব্যবস্থা তৈরি করে এবং মানুষের মধ্যে যুক্তি, ধারনা, মতামত, সম্পর্ক ও বৈচিত্রের পরিবর্তন উপস্থাপন করে।  ইন্টারনেটের প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষেরা সময় এবং দূরত্বের সীমার বাইরে অন্য সম্প্রদায়ের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন এবং গভীরভাবে তথ্যের সাথে নিজের সংস্কৃতির পরিচিতি করতে পারেন। সামাজিক মাধ্যমের প্রাসঙ্গিকতা, সাম্প্রদায়িকতা ও সম্পর্কের পরিচালনা ইন্টারনেটের মাধ্যমে আরও উন্নত হয়, যা সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

অর্থনীতির পরিবর্তন

বর্তমানে িইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা অসংখ্য সম্ভাব্য মাধ্যমে আর্থিক পদ্ধতির বাস্তবায়নে স্বপ্নের মতো পরিবর্তন সৃষ্টি করছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যবসা, মার্কেটেং, বিতরণ, অর্থ লেনদেন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়াও ইন্টারনেট প্রযুক্তির কারণে অর্থনৈতিক সম্পদ মূল্য নির্ধারণ ও অর্থনীতির প্রভাব অর্জন করছে নতুন সীমা। ইন্টারনেট সংস্কৃতির এ প্রভাব এখনও অধিকাংশ দেশে অনুভূত হয়নি কিন্তু এটি ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনীতিতে বিপুল পরিবর্তন আনবে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভূমিকা

আধুনিক রাজনীতিতে ইন্টারনেট একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ বিষয় হিসাবে প্রভাব ফেলছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল, পক্ষ এবং সরকারের কর্মকার্ড সহজলভ্য হয়েছে। সাধারন মানুষের মতামত ও আপত্তি প্রকাশের প্রবাহ বেশি হয়েছে। ইন্টারনেট এখন রাজনৈতিক প্রচার, আলোচনা ও সামাজিক সংস্থাগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে  প্রচলিত হয়ে আসছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মনোনয়ন বা নামকরন প্রচার করতে পারেন এবং সামাজিক মাধ্যমে এ মনোনয়ন প্রকাশ করা হয়। এছাড়াও সাম্প্রতিককালে সামাজিক মাধ্যমগুলোর প্রচার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়গুলোর উপর আলোনা প্রভাবিত হয়।

ইন্টারনেট সংস্কৃতির অপব্যবহার

ইন্টারনেট পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। বিশ্বায়নের এ যুগে জীবনের সব ক্ষেত্রে এখন ইন্টারনেটের ব্যবহার ছাড়া কল্পনা করা যায় না। খোলা আকাশের মতো ইন্টারনেটও সবার জন্য অবারিত। প্রযুক্তির ব্যবহার খারাপ নয়। তবে ব্যবহারের ওপরই এর ভাল মন্দ নির্ভর করে। ইন্টারনেটের অপপ্রয়োগ সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। ফেসবুক শুধু প্রচুর সময় কেড়ে নিচ্ছে তা নয় বরং আমাদের আচার আচরন, অভ্যাস িএবং জীবনের পদ্ধতিতে নেতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ভূয়া খবর এবং গুজব ছড়ানোসহ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা বার বার বেছে নিচ্ছে ফেসবুক তথা ইন্টারনেটকে। ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার অশ্লীলতার সাথে সাথে বাড়ছে অনলাইনে জুয়া খেলা, জঙ্গীবাদ, দেশদ্রোহের মতো ইত্যাদি ভয়ানক অপরাধপ্রবনতা। বৈদেশিক সংস্কৃতির নির্বিকার গ্রহণ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরুপ। আজকের তরুনরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ কিন্তু অপসংস্কৃতি তাদের জীবনকে ধ্বংসের দিনে নিয়ে যাচ্ছে। তাই ইন্টারনেট সংস্কৃতি যেনো অপসংস্কৃতি না হয়ে ওঠে এ ব্যাপারে তরুন জনগোষ্ঠীসহ সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

ইন্টারনেট সংস্কৃতি ও বিশ্বব্যবস্থা একটি সম্পূর্ণ নতুন বিষয় এবং এর পরিধি ব্যাপক। এর ফলে বিস্ময়কর এক সংস্কৃতির সমাজ ব্যবস্থার উন্থান ঘটেছে। আমরা হোমো সেপিয়েন্স, মনুষ্য প্রজাতি, একাকী টিকতে পারি না। তাই সর্বাবস্থায় কোন না কোন সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে থাকতে চাই। আমাদের সমাজের ও সাংস্কৃতির প্রক্রিয়াগুলির ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সংস্কৃতি দ্বারা আমরা প্রতিনিয়ত অনেক পরিবর্তন দেখছি। কোনে নিদির্ষ্ট সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে না, বরং এটি বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পরিবর্তিত হয়ে থাকে।












Post a Comment (0)
Previous Post Next Post